অপরাধ ‍ও দুর্নীতি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ঢাকা লিড নিউজ

গণপূর্ত প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি

সরকারি চাকরিকে ঢাল বানিয়ে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের শের-ই-বাংলা নগর ৩নং উপবিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসডিই) মাসুম বিল্লাহ—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহলে। সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠতা এবং বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করা এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এখন যোগ হয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে হাজার কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ।

অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে ইউরোপীয় লিফটের নামে নিম্নমানের ভারতীয় লিফট সরবরাহ, নকল ফায়ার পাম্প স্থাপন এবং একই প্রতিষ্ঠানের দ্বৈত নামে সরকারি টেন্ডারে অংশ নিয়ে পিপিআর (PPR) লঙ্ঘনের মাধ্যমে বড় ধরনের দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন মাসুম বিল্লাহ ও গণপূর্তের কয়েকজন কর্মকর্তা। এ ঘটনায় ইতোমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মাসুম বিল্লাহর স্থায়ী বাড়ি ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার শুক্তাগর ইউনিয়নের কাঠিরপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা ইউনুস আলী ছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সদস্য। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পরিবারটির মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই ছিল একটি ভাঙা টিনের ঘর।

বুয়েটে অধ্যয়নকালেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন মাসুম বিল্লাহ। পরে ঝালকাঠি জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতির মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠতা লাভ করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, বাবার বিতর্কিত ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী পদে চাকরি নেন তিনি। এরপর থেকেই শুরু হয় তাঁর দ্রুত উত্থান।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সরকারি চাকরির আড়ালে অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক বনে যান মাসুম বিল্লাহ। কাস্টমস কর্মকর্তা বড় ভাই শফিউল বসরের সঙ্গে মিলে রাজাপুরে পৈতৃক ভিটায় নির্মাণ করেছেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। এছাড়া বাবা, মা, স্ত্রী ও ভাইয়ের নামে রাজাপুর উপজেলায় প্রায় ১০০ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। রাজধানীর উত্তরা, বনশ্রী ও সাভার এলাকায় রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি।

গত ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর মাসুম বিল্লাহর গ্রামের বাড়িতে সংঘটিত হয় একটি আলোচিত ডাকাতির ঘটনা। স্থানীয়দের দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক আওয়ামী লীগ নেতা তাঁদের বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার ওই বাড়িতে এনে রেখেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ডাকাত দল ওই রাতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা এবং কয়েকশ ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। তবে সম্পদের প্রকৃত উৎস প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থানায় করা এজাহারে মাত্র ১৩ ভরি স্বর্ণ, নগদ ৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকা এবং চারটি মোবাইল ফোন খোয়া যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

জানা যায়, ২০১৬ সালে নগর গণপূর্ত বিভাগের স্টাফ অফিসার (সহকারী প্রকৌশলী) থাকাকালে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন মাসুম বিল্লাহ। অভিযোগ রয়েছে, গোপালগঞ্জের ছাত্রলীগ ক্যাডার দীন ইসলামের মালিকানাধীন ‘এস এ এন্টারপ্রাইজ’সহ বিভিন্ন পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে ১ থেকে ২ শতাংশ হারে কমিশন নিতেন তিনি। এভাবে প্রায় ২ কোটি টাকা নগদ কমিশন গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

পরে পদোন্নতি পেয়ে মিরপুর উপবিভাগ-২ এর দায়িত্বে গিয়ে পাইকপাড়া অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার এবং অগ্রিম বিল প্রদানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এরপর প্রভাব খাটিয়ে বদলি হন শের-ই-বাংলা নগর ৩নং উপবিভাগে।

গত জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অদৃশ্য প্রভাব ও অর্থের জোরে তিনি একই পদে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন বঞ্চিত ঠিকাদার ও কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, প্রশাসনের ভেতরে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের কারণেই এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গণপূর্ত কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সরকারি ক্রয়ে ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড গত দুই থেকে তিন বছরে গণপূর্তের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার লিফট সরবরাহের কাজ পায়।

চুক্তি অনুযায়ী ফিনল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত ‘Kone Lift’ সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে ভারতের আঞ্চলিক অফিস থেকে এলসি খুলে নিম্নমানের ভারতীয় লিফট সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শিপমেন্ট দেখানো হয় জার্মানি থেকে, যদিও সেখানে এই ব্র্যান্ডের কোনো কারখানা নেই। ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের মূল্য ধরে বিল উত্তোলন করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বিষয়টি জেনেও অনুমোদন দিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের আরেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে ‘UL listed’ ফায়ার পাম্প সরবরাহের চুক্তি নিলেও বাস্তবে সরবরাহ করা হয় নিম্নমানের ও ‘Non-UL listed’ পাম্প। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এ ধরনের জালিয়াতি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও মানুষের জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি উঠেছে একই প্রতিষ্ঠানের দ্বৈত নামে টেন্ডারে অংশগ্রহণ নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, পিপিআর ২০০৮-এর নিয়ম ভেঙে একই মালিকানার প্রতিষ্ঠান দুটি ভিন্ন বানান ও পৃথক TIN/BIN ব্যবহার করে একই টেন্ডারে অংশ নেয়।

তথ্য অনুযায়ী, “Rangpur Metal Industries Limited” নামে ১০১টি কাজ নিয়ে প্রায় ২৮৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং “Rangpur Metal Industries Ltd.” নামে ১১২টি কাজ নিয়ে প্রায় ৭৭১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার কার্যাদেশ নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ২১৩টি কার্যাদেশের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৬০ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

অভিযোগে বলা হয়েছে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন—শের-ই-বাংলা নগর ৩নং উপবিভাগের এসডিই মাসুম বিল্লাহ, ঢাকা জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান, চট্টগ্রাম জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম এবং সদর দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন।

তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া শিপমেন্ট নথিপত্র যাচাই ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া, নিম্নমানের যন্ত্রপাতির ছাড়পত্র প্রদান এবং একই প্রতিষ্ঠানের দ্বৈত নামে টেন্ডারে অংশগ্রহণকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সচেতন নাগরিক মো. মিলন মৈত্রা দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে অডিট ফার্ম ও ডিভিএস (DVS) যাচাইয়ে নথির অসামঞ্জস্যতা এবং আরজেএসসি (RJSC) নিবন্ধন নীতিমালা লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরা হয়।

এদিকে সম্প্রতি দুদক মাসুম বিল্লাহ, তাঁর কাস্টমস কর্মকর্তা ভাই শফিউল বসর এবং স্ত্রী নাইমা আক্তার সুমার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহারের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি উন্নয়ন বাজেট ও ক্রয় প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তাদের যৌথ লুটপাটের এটি একটি বড় উদাহরণ। ইউরোপীয় পণ্যের নামে নিম্নমানের ভারতীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং দ্বৈত নামে হাজার কোটি টাকার টেন্ডার গ্রহণ শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।

তাদের দাবি, সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা সুরক্ষা এবং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে দুদক, বিপিপিএ (BPPA) ও সিপিটিইউ (CPTU)-এর সমন্বিত ও কঠোর তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *