নিজস্ব প্রতিবেদক:
কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে কথিত দালাল চক্রের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদাবাজি, মাসোহারা আদায় এবং মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন ভুক্তভোগী, স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন চালকদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগে মিরপুর হাইওয়ে থানার কিছু সদস্য ও কথিত দালাল চক্রের সম্পৃক্ততার দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও সরকারি যাচাই সম্ভব হয়নি।
গত ২ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কুটি চৌমুহনী থেকে দেবিদ্বারের উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেলে যাওয়ার পথে মিরপুর হাইওয়ে থানার সামনে এই প্রতিবেদকের চোখে একটি ঘটনা পড়ে। সন্ধ্যা আনুমানিক ৮টার দিকে দেখা যায়, কথিত দালাল নাঈম শিকদার বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে চালকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন বলে প্রতিবেদকের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাকে বাধা দেননি।
প্রতিবেদক নাঈম শিকদারের কাছে টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। প্রতিবেদকের দাবি, এ সময় উপস্থিত এক পুলিশ সদস্যও তাকে সরে যেতে ইঙ্গিত করেন।
একাধিক পরিবহন চালক ও যাত্রী অভিযোগ করেন, সিএনজি অটোরিকশা, ট্রাক্টর, ড্রাম ট্রাক, পিকআপ, ভারতীয় অবৈধ পণ্যবাহী গাড়ি এবং বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়। তাদের দাবি, যারা নিয়মিত অর্থ প্রদান করেন, তাদের বিরুদ্ধে সাধারণত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অন্যদিকে, যারা অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো বা বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া যায়, কিছু ক্ষেত্রে চালকদের কাছ থেকে ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হলেও কোনো সরকারি রসিদ দেওয়া হয় না। কসবা বিষ্নপুর গ্রামের ট্রাক ভ্রাইভার এরশাদ বলেন প্রতি ট্রাক থামিয়ে কাগজ পত্র সঠিক থাকলেও ১০০টাকা করে পুলিশকে দিতে হয়,এছাড়া বিভিন্ন যানবাহনের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয় কি না, তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত ৯ মে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর তৎকালীন ওসি আক্তারুজ্জামানের বদলি হলেও কথিত চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। বরং বর্তমানে দালাল চক্রের সদস্যসংখ্যা আরও বেড়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
বড়শালঘর গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন জমদ্দার বলেন, “আমার সামনেই পুলিশ বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে টাকা নিয়েছে।” একই গাড়ির যাত্রী ইউসুফপুর গ্রামের ইব্রাহিমও একই ধরনের দাবি করেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিদিন কয়েক হাজার সিএনজি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন এই মহাসড়ক ব্যবহার করে এবং এসব যানবাহনের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়। তবে অভিযোগে উল্লেখিত আর্থিক পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ২ জুন মিরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম রাজিব খানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “নাঈম নামের কাউকে আমি চিনি না।”
থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মজিবুর রহমান অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনার কাছে কী প্রমাণ আছে?”
উল্লেখ্য, মিরপুর হাইওয়ে থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। পরে তিনি ওই থানা থেকে বদলি হন। তবে ওই অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২৮ জুন এই প্রতিবেদক বড়শালঘর এলাকার হাজি সামসু মিয়ার কাঠবাগানের সামনে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে অনুসন্ধান চালান। প্রতিবেদকের দাবি, সেখানে কথিত দালাল ও পুলিশের উপস্থিতিতে বিভিন্ন যানবাহন থেকে টাকা আদায়ের দৃশ্য ধারণের চেষ্টা করলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বিষয়টি ওসিকে জানান। পরে ওসি প্রতিবেদককে থানায় যেতে বলেন।
প্রতিবেদকের অভিযোগ, থানায় নেওয়ার পর ওসি তার মোবাইল ফোন নিজের কাছে নিয়ে পরীক্ষা করেন, অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং সংবাদ প্রকাশ করলে পরিণতি ভালো হবে না বলে হুমকি দেন। প্রতিবেদকের আরও দাবি, ওসি প্রকাশ্যে কথিত চাঁদাবাজির দৃশ্য ধারণ করাকে অপছন্দ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দৃশ্য ধারণ না করার জন্য সাংবাদিককে সতর্ক করেন। এছাড়া মোবাইলে সংরক্ষিত কিছু ভিডিও মুছে ফেলা হয় এবং সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য ২ হাজার টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয় বলে প্রতিবেদকের অভিযোগ। প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ওসি রেজাউল করিমের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকজন কথিত দালালের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করা হয়েছিল যে তাদের মাধ্যমে মাসোহারা আদায় করা হতো। বর্তমানেও একই ধরনের অভিযোগ স্থানীয় সূত্রে পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে তারা দাবি করেন, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিমকে প্রত্যাহার বা বদলি করে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ককে চাঁদাবাজি, দালালমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও নিরাপদ সড়ক হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক,তবে এবিষয়ে অনুসন্দান অব্যাহতরয়েছে, আগামি পর্বে বিস্তারিত থাকছে

