অপরাধ ‍ও দুর্নীতি অর্থনীতি ও ব্যবসা ঢাকা লিড নিউজ

গণপূর্তে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের দায়িত্বে থাকা একটি বড় প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও ১৭ কোটি টাকার বিল নিয়ে অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ, দুদকে লিখিত আবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের দায়িত্বে থাকা একটি বড় প্রকল্পের প্রায় ১৭ কোটি টাকার বিলকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারী ও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছেন, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অনুমোদিত বিলের অঙ্কের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে। এই ঘটনায় জনৈক আলদ্দিন ওয়াজেদ দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পে যে উচ্চ অঙ্কের বিল করা হয়েছে, তার বিপরীতে সমপরিমাণ কাজ বা সরঞ্জাম সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নথিতে দেখানো দাম বাজারমূল্যের তুলনায় অতিরঞ্জিত, এবং বিল অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নিয়মনীতি উপেক্ষার অভিযোগ রয়েছে।

কয়েকটি অভ্যন্তরীণ নথিতে বিল অনুমোদনের সময় অস্বাভাবিক তড়িঘড়ি, নথি যাচাই ছাড়া পেমেন্ট প্রসেসিং, এমনকি কিছু ফাইলের তারিখে “বেমিল”—এসব বিষয়কে অনিয়মের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ই/এম সার্কেল-৩ এর টেন্ডার ও ক্রয়ব্যবস্থায় প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের প্রভাব বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানান। তাদের দাবি, তাঁর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের নির্দিষ্টভাবে সুবিধা পাওয়া, সরঞ্জাম ক্রয় ও সরবরাহে পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া, এবং গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডারে একটি স্থায়ী গোষ্ঠীর আধিপত্য দেখা যায়।

ঠিকাদার আলদ্দিন ওয়াজেদ বলেন, ১৭ কোটি টাকার বিলটি এই প্রভাব বলয়ের আরেকটি উদাহরণ হতে পারে। প্রকৌশলী মাহবুবুর ঘুষ ছাড়া কাউকে কাজ দেন না। বিশেষ করে তিনি আত্মীয় স্বজনের বাইরে কাজ দিতে অনিহা। কারণ প্রতিটি কাজের তার অগ্রিম কমিশন নির্ধারিত থাকে।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পে যে উচ্চ অঙ্কের বিল করা হয়েছে, তার বিপরীতে সমপরিমাণ কাজ বা সরঞ্জাম সরবরাহের প্রমাণ নেই এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নিয়মনীতি উপেক্ষা করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের নাম্বারে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজন ঠিকাদার বলেন, “স্যারের বিরুদ্ধে লিখলে সমস্যা হতে পারে। তাঁর হাত অনেক লম্বা।”

গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ ধরনের অঙ্কের বিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি গুরুতর অনিয়ম ও সরকারি অর্থের অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি তদন্ত ছাড়া পরিষ্কার হবে না। তিনি আরও জানান, টেন্ডার, ক্রয় ও বিল প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। নিয়ম ভাঙা হয়েছে কি না তা নিরপেক্ষ তদন্তেই প্রমাণিত হবে।

দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রকল্পে ১৭ কোটি টাকার বিল নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নথিপত্রের বৈষম্য বা আর্থিক অস্বচ্ছতা পাওয়া গেলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসন্ধানের আওতায় পড়ে।

তিনি যোগ করেন, অভিযোগকারীরা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে প্রাথমিক যাচাইয়ের পর আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি অডিট ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ বলেন, তারিখের অসঙ্গতি, তড়িঘড়ি অনুমোদন এবং যাচাইবিহীন পেমেন্ট—এসব উচ্চ ঝুঁকির সংকেত। এটি যদি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের অংশ হয়, তবে এর প্রভাব কেবল প্রকল্প সীমায় থাকবে না; এটি সিস্টেমিক হতে পারে।

এ বিষয়ে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। স্বাধীন ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত করতে হবে, তাহলে দুর্নীতিবাজদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *