অপরাধ ‍ও দুর্নীতি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ঢাকা

নিজস্ব কারখানা অচল, ঠিকাদারনির্ভর আসবাব কেনে গণপূর্ত

কাঠের কারখানা নামে গণপূর্ত অধিদপ্তরের রয়েছে আলাদা একটি ইউনিট। সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থা, হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, অফিস-আদালতসহ নানা প্রতিষ্ঠানের জন্য আসবাবপত্র সরবরাহের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এই ইউনিট। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ প্রকৌশলী সবই রয়েছে কারখানাটিতে। কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে সেখানে কোনো উৎপাদন কার্যক্রম নেই।

এই সময়ে সরকারি প্রকল্পের আসবাবপত্রের নকশা, স্পেসিফিকেশন ও ব্যয় প্রাক্কলন তৈরি থেকে শুরু করে উৎপাদন এবং সরবরাহ সবই হচ্ছে গুটিকয়েক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাঠের কারখানায় দায়িত্ব পালনকারী প্রকৌশলীদের অনেকে ইউনিটটিকে সচল বা কার্যকর করার উদ্যোগ না নিয়ে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। ফলে দিনে দিনে কয়েকজন ফার্নিচার ব্যবসায়ীর হাতে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়ছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই বিশেষায়িত ইউনিট।

বহাল রয়েছে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুর-৬ নম্বরে অবস্থিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম কাঠ কারখানা উপবিভাগে এখনো পৃথক প্রশাসনিক ও প্রকৌশল কাঠামো বহাল রয়েছে। সেখানে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী, একজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, দুজন সহকারী প্রকৌশলী এবং দুজন উপসহকারী প্রকৌশলী কর্মরত রয়েছেন। তবে রহস্যজনকভাবে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো উৎপাদন হচ্ছে না।

জানা গেছে, পাকিস্তান আমলে সরকারি দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার জন্য উন্নতমানের কাঠের আসবাবপত্র তৈরির উদ্দেশ্যে এই কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। একসময় সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক কাজ করতেন। সরকারি ভবনের দরজা-জানালা, চেয়ার-টেবিল, আলমারি, ক্যাবিনেটসহ বিভিন্ন কাঠজাত সামগ্রী এখানেই তৈরি হতো। পরবর্তী সময়ে কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতিও সংযোজন করা হয়।

তবে প্রায় এক দশক আগে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে ধীরে ধীরে সব কাজ চলে যায় বেসরকারি ঠিকাদারদের হাতে। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কারখানাটি চালু হওয়ার কথা উঠলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

নকশা থেকে সরবরাহ সবই ঠিকাদারদের মাধ্যমে

সূত্রগুলো বলছে, কাঠের কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তৈরির পরিবর্তে প্রতিটি কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। শুধু উৎপাদন নয়, নকশা প্রণয়ন, স্পেসিফিকেশন তৈরি এবং ব্যয় প্রাক্কলনের মতো কারিগরি কাজও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক যুগে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে আসবাবপত্র সরবরাহ ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ ঘুরেফিরে পেয়েছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে প্যারাডাইম ফার্নিচার লিমিটেড, হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড, লিগ্যাসি ফার্নিচার লিমিটেড, নাদিয়া ফার্নিচার লিমিটেড, পারটেক্স ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, অটবি লিমিটেড, আখতার ফার্নিচার লিমিটেড এবং ফার্নিচার কনসেপ্ট অ্যান্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেড।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের কারিগরি তথ্যের ভিত্তিতেই আসবাবপত্রের নকশা ও স্পেসিফিকেশন প্রস্তুত করা হয়। পরে একই ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই সেই আসবাবপত্র কেনা হয়। এতে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

প্যারাডাইমকে ঘিরে তদন্ত, পরে সখ্যের অভিযোগ

সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগী হয়ে তদন্ত শুরু করেন। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করে সংস্থাপন শাখায় বস্তাবন্দি করে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এরই মধ্যে সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সঙ্গে প্যারাডাইমের সখ্য গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরবর্তী সময়ে তাঁর মাধ্যমেই প্যারাডাইম আবারও সচিবালয়ে কাজ পেতে শুরু করে। বর্তমানে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুরের কার্যালয়ে সাজসজ্জার কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি বলে জানা গেছে।

সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরী এর আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সম্পদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে বিপুল ব্যয়ে বিজয় সরণিতে অবস্থিত গণপূর্ত অফিস কমপ্লেক্সে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ ও একটি পাঠাগার নির্মাণ করা হয়। এসব স্থাপনা এখনো সেখানে বিদ্যমান।

তবে প্যারাডাইমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং কাঠের কারখানার বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরী বলেন, ‘কাঠের কারখানার কাজের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি বগুড়া থেকে গত বছরের ডিসেম্বরে বর্তমান কর্মস্থলে যোগদান করেছি। কাজেই সচিব আগে কী করেছেন, তা আমার জানা নেই।’

সিন্ডিকেটে যুক্ত ফার্নিচার কনসেপ্ট

জানা গেছে, গত কয়েক বছরে কাঠের কারখানাকে ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটে ‘ফার্নিচার কনসেপ্ট’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত ও শীর্ষস্থানীয় ফার্নিচার কোম্পানিগুলোর মতো পরিচিতি বা সক্ষমতা না থাকলেও রহস্যজনকভাবে প্রতিষ্ঠানটি বিপুল পরিমাণ আসবাবপত্রের কাজ পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে আসবাবপত্র কেনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমছে এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

দরপত্রে বিধিবহির্ভূত প্রক্রিয়ার অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আসবাবপত্র কেনার ক্ষেত্রে বিধিবহির্ভূতভাবে একের পর এক দরপত্র পরিচালনা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, যেসব ক্রয় ‘গুডস’ ক্যাটাগরিতে হওয়ার কথা, সেগুলোর কিছু ‘ওয়ার্কস’ ক্যাটাগরিতে আহ্বান করা হয়েছে।

কোথাও অভিজ্ঞতার শর্ত উপেক্ষা, কোথাও প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই প্যাকেজ পরিবর্তন এবং কোথাও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠনের নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন, পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব অনিয়মের কারণে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

‘জনবল না থাকায় কারখানা চালু করা যায়নি’

গণপূর্ত (ই/এম) জোনের কাঠের কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দার বলেন, ‘যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, কিন্তু জনবল না থাকায় তা চালু করা যায়নি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের নভেম্বরে জনবল কাঠামোর প্রস্তাব তৈরি করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল পাওয়া যাবে এবং কারখানাটি সচল করা সম্ভব হবে।’

ঠিকাদারদের মাধ্যমে নকশা, ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন, ‘ড্রয়িং, ডিজাইন বা স্পেসিফিকেশনের কাজ ঠিকাদারদের দিয়ে করানো হয় না। এসব কাজ বিভাগের কর্মকর্তারাই সম্পন্ন করেন। শুধু বাজারদর যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোটেশন নেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘এই খাতে কাজ করে, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম হলেও আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৮টি কোম্পানিকে কাজ দিয়েছি।’

নিজস্ব কারখানা সচল থাকলে কমত সরকারি ব্যয়

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, নিজস্ব কাঠের কারখানাটি সচল থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। এতে সরকারের ব্যয় কমার পাশাপাশি আসবাবপত্রের মান নিয়ন্ত্রণও সহজ হতো।

কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখে পুরো প্রক্রিয়া ঠিকাদারনির্ভর করে তোলায় বিশেষায়িত এই ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের সাশ্রয়, কারখানার আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং দীর্ঘদিন ধরে বহাল থাকা প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কারখানাটি সচল করা গেলে সরকারি প্রকল্পের আসবাবপত্র উৎপাদনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয় রোধ, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সহজ হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *