গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ রাখতে হচ্ছে মেশিন, আর কম গ্যাসের চাপে স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না বয়লার, ডাইং, ওয়াশিংসহ বিভিন্ন উৎপাদন ইউনিট। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, কমছে শ্রমিকদের আয় এবং লোকসানের বোঝা বাড়ছে শিল্প উদ্যোক্তাদের। সংকট দীর্ঘায়িত হলে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রূপগঞ্জের তারাবো, বরাবো, রূপসী, বরপা, কর্ণগোপ, আউখাবো, ভুলতা, গোলাকান্দাইল, মুড়াপাড়া, হাঁটাবো ও কাঞ্চনসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ডাইং, নিটিং, স্পিনিং, ফুড প্রসেসিংসহ নানা ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব কারখানার উৎপাদন অনেকাংশেই গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রায় না থাকায় অনেক সময় মেশিন চালু করেও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও এতে ডিজেলের বাড়তি খরচ যুক্ত হচ্ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে ব্যয়।
গ্যাস সংকট / স্থবির হবিগঞ্জ শিল্পাঞ্চল, ছাঁটাই আতঙ্কে দেড়লাখ শ্রমিক
কারখানা মালিকদের ভাষ্য, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের মজুরি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ঠিকই বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় এভাবে চলতে থাকলে লোকসানের বোঝা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
‘লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো উৎপাদন করা যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় গ্যাস ও বিদ্যুতের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে মালিক-শ্রমিক কেউই টিকতে পারবেন না। কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রূপগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৭ শতাধিক কলকারখানা রয়েছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৪০ মেগাওয়াট। বর্তমানে হরিপুর থেকে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে রূপগঞ্জের বিভিন্ন সাবস্টেশনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এর একটি অংশ পার্শ্ববর্তী আড়াইহাজার উপজেলাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে বরাদ্দের ঘাটতি ও অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে রয়েছে ভোল্টেজের ওঠানামা। এতে শিল্পকারখানার আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জিএম আবুল বাশার আজাদ বলেন, জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের বরাদ্দ কমে গেছে। রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারের যে অংশ নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতায়, সেখানে বরাদ্দ কম থাকায় অতিরিক্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কোনো কোনো লাইনে ছয়, সাত এমনকি আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
কমছে উৎপাদন, অনিশ্চয়তায় শ্রমিক
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শুধু মালিকরাই নন, উদ্বেগে রয়েছেন শিল্পকারখানার শ্রমিকরাও। উৎপাদন কমে যাওয়ায় ওভারটাইমের সুযোগ কমেছে। এতে অনেক শ্রমিকের মাসিক আয়ও কমে গেছে।
‘তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে তারা ঠিকমতো উৎপাদন করতে পারছেন না। স্বাভাবিক সময়ে সাধারণ ডিউটির পর শ্রমিকরা কিছুটা ওভারটাইম করলেও এখন সেই সুযোগ নেই। ফলে তাদের আয় কমে যাচ্ছে। শ্রমিকরা সাধারণ কর্মঘণ্টাতেই পর্যাপ্ত কাজ পাচ্ছেন না। দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে শিল্পকারখানাগুলো বন্ধের দিকে চলে যেতে পারে’
স্থানীয় একটি কারখানার শ্রমিক সাইফুদ্দিন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো উৎপাদন করা যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় গ্যাস ও বিদ্যুতের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে মালিক-শ্রমিক কেউই টিকতে পারবেন না। কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
গরমে অস্থির জনজীবন, বিদ্যুতের জন্য কাটছে নির্ঘুম রাত
এ ওয়ান পোলার লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার কামরুল হাসান বলেন, আমার ইউনিটে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত। তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে তারা ঠিকমতো উৎপাদন করতে পারছেন না। স্বাভাবিক সময়ে সাধারণ ডিউটির পর শ্রমিকরা কিছুটা ওভারটাইম করলেও এখন সেই সুযোগ নেই। ফলে তাদের আয় কমে যাচ্ছে। শ্রমিকরা সাধারণ কর্মঘণ্টাতেই পর্যাপ্ত কাজ পাচ্ছেন না। দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে শিল্পকারখানাগুলো বন্ধের দিকে চলে যেতে পারে।
জিতু টেক্সটাইলের মালিক জিতু কবির ভূঁইয়া বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকার পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন চালাতে গেলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। আবার জেনারেটর দিয়েও সব ধরনের যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হয় না।গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল। বয়লার, ডাইং, ওয়াশিং ও বিভিন্ন উৎপাদন ইউনিট সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস প্রয়োজন। চাপ কমে গেলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, উৎপাদন কমলেও শ্রমিক, কারখানা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কমছে না। ফলে প্রতিদিনই লোকসানের বোঝা বাড়ছে।
নতুন সাবস্টেশনে আশার আলো
তবে সংকট সমাধানে নতুন সাবস্টেশন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে আড়াইহাজারে একটি নতুন সাবস্টেশন চালু হওয়ার কথা রয়েছে। সেটি চালু হলে হরিপুর থেকে বর্তমানে আড়াইহাজারে যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, তার একটি অংশ রূপগঞ্জে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এতে রূপগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জিএম আবুল বাশার আজাদ বলেন, আড়াইহাজারে নতুন একটি গ্রিড চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেটি চালু হলে রূপগঞ্জের বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই দূর হবে।
বেসরকারি জ্বালানি বিপণন নিয়ন্ত্রণে বিইআরসির সক্ষমতা কতটুকু?
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, শিল্পাঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে আড়াইহাজারে নতুন একটি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে এটি চালু হওয়ার কথা। সাবস্টেশনটি চালু হলে আড়াইহাজারে বর্তমানে সরবরাহ করা বিদ্যুতের একটি অংশ রূপগঞ্জে যুক্ত হবে। এতে সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে গ্যাস সংকটের বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির জাত্রামুড়া অফিসের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জাফরুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

