অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অপরাধ ‍ও দুর্নীতি ময়মনসিংহ ময়মনসিংহ বিভাগ সারাদেশ

সাংবাদিক ম্যানেজে ডিআইজি তৌহিদুলের দৌড়ঝাঁপ, মুখ খুলছেন ভুক্তভোগীরা

বিচার দাবিতে ভুক্তভোগী নারীর আকুতি

বরখাস্ত কারারক্ষীকে পাঠিয়ে ঘুষের প্রস্তাব

ডিআইজি কর্তৃক ঘুষ গ্রহণের আরো তথ্য ফাঁস

বাংলাদেশ কারাগারের ময়মনসিংহ বিভাগের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রথম পর্বের সংবাদ প্রকাশের পর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে থলের বিড়াল। ওই সংবাদে উল্লেখ ছিল তার দুর্নীতি ও অনৈতিক কাজের তথ্য। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে এবার সামনে এসেছে বিশ্বস্ত সহযোগীর দ্বারা নিজ কর্মসংস্থা কারাগারের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার ভয়ঙ্কর খবর। এই বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আসছে পরবর্তী পর্বে। আজ দ্বিতীয় পর্বে থাকছে—দুর্নীতি ও অনৈতিকতা প্রসঙ্গে সংবাদ প্রকাশের পর লোক পাঠিয়ে সাংবাদিক ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা এবং পূর্বের সংবাদ সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের দেওয়া নতুন কিছু তথ্য। এমনকি, বিভিন্ন অজুহাতে অধীনস্থ কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের তথ্য দিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

বরখাস্ত কারারক্ষীকে পাঠিয়ে সাংবাদিক ম্যানেজের চেষ্টা:

ময়মনসিংহের ডিআইজি (প্রিজন) তৌহিদুল ইসলামের দুর্নীতি ও অনৈতিকতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়। ১ এপ্রিল প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠানো বার্তায় জনৈক ব্যক্তি লেখেন, “ভাইজান আমি আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই। ডিআইজি প্রিজন্স তৌহিদ স্যার পাঠাইছিল।” প্রতিবেদক তাকে পত্রিকা অফিসের ঠিকানা পাঠিয়ে সাক্ষাতের সময় দেন। ২ এপ্রিল দুপুরে ওই ব্যক্তি এসে প্রতিবেদকের কাছে পরিচয় দেন যে, তার নাম হামিদুর রহমান; কারারক্ষী হিসেবে কারাগারে কর্মরত আছেন। ডিআইজি তৌহিদুল ইসলাম ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিভিন্ন পদে থাকাকালে তার সঙ্গে ১২ বছর কাজ করেছেন। এ সময় ডিআইজির পক্ষে সাফাই গেয়ে হামিদুর বলেন, “তৌহিদুল ইসলামের ক্ষমতার হাত অনেক লম্বা। তিনি ক্ষেপে গেলে আইজি স্যারকেও সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ডিবির হারুন স্যার তার ব্যাচমেট এবং কাছের বন্ধু।”

ডিআইজি তৌহিদুল ইসলামকে সন্তানের পিতা দাবি করা নারীর পরিবার প্রসঙ্গে বিভিন্ন রকম অভিযোগ তুলে ধরেন হামিদুর। একপর্যায়ে তিনি বলেন, “আমরা ভাই-ভাই কথা বলছি। এসব নিউজ করে কোনো লাভ নেই। স্যার পাঠিয়েছে, আপনাদের যদি কোনো চাওয়া-পাওয়া থাকে সেটা ব্যবস্থা করে দেবেন।” এভাবেই প্রতিবেদককে অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকার প্রস্তাব দেন হামিদুর। ওই কারারক্ষী ঠিক কী কী অপরাধের কারণে বর্তমানে বরখাস্ত আছেন এবং তার কারাগারবিরোধী কাণ্ডের সঙ্গে ডিআইজি তৌহিদুল ইসলাম কীভাবে সম্পৃক্ত, এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত তথ্য আসছে আগামী পর্বে।

ভুক্তভোগীদের যোগাযোগ:

প্রথম পর্বের সংবাদে ডিআইজি তৌহিদুল ইসলামের নারী সংক্রান্ত অনৈতিকতার তথ্য উঠে আসার পর প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মুন্নি আহমেদ নামের এক নারী, যিনি নিজেকে সংবাদকর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানান, এসব বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে ডিআইজি তৌহিদুল অন্তরাল থেকে তাকে নানাভাবে হেনস্তা করেছেন। তার একটি ব্যবসায়িক বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠিয়ে তাকে ‘চাঁদাবাজ’ আখ্যায়িত করে চাকরিচ্যুত করেছেন বলেও দাবি করেন মুন্নি।

যে তরুণীর সঙ্গে ডিআইজি তৌহিদুলের অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, ওই তরুণীর মা-ও প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়েছেন। ওই নারী বলেন, একটি মামলায় তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হাজতি হিসেবে ছিলেন বছরখানেক। তখন তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে তার সখ্যতা হয়। কারাগারে মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতেন ওই নারীর কিশোরী মেয়ে। সেখান থেকেই ডিআইজির ‘টার্গেটে’ পড়ে যায় মেয়েটি। এরপর তিনি কারামুক্ত হওয়ার পরেও অস্থায়ীভাবে বিভিন্ন কাজের সুবাদে কারাগারে যাতায়াত করতেন। সখ্যতার জায়গা থেকে একসময় তার কিশোরী মেয়ের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান তৌহিদুল। ওই নারী দাবি করেন, তৌহিদুল ইসলাম জীবন গড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার মেয়ের সঙ্গে অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত হন। সেই সূত্রে প্রায় প্রতি মাসেই তাদের বিভিন্ন অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিতেন। তবে ২০২০ সালে কিশোরী মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই দূরত্ব বাড়িয়ে দেন ডিআইজি।

ওই নারীর বক্তব্য হচ্ছে, “ডিআইজির সন্তান আমার মেয়ে পৃথিবীতে নিয়ে আসার পরও প্রায় ৪ বছর বাচ্চার দুধ কেনা থেকে শুরু করে সকল খরচ বাবদ তৌহিদুল ইসলাম নিয়মিত টাকা দিতেন। তবে দুই-আড়াই বছর যাবত তিনি আর খোঁজ নেন না।”

ওই নারী জানান, নিরুপায় হয়ে নাতির পিতৃপরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এর একটি সুষ্ঠু সুরাহা করতে আইজি (প্রিজন) সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে সবকিছু অবহিত করেছেন। আইজি সাহেব সুষ্ঠু সমাধানের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকরী কোনো উদ্যোগের নমুনা দেখতে পাচ্ছেন না।

সার্বিক বিষয়ে ডিআইজি তৌহিদুল ইসলামের মন্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তার অসহযোগিতার কারণে যোগাযোগ সফল হয়নি।

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *