অর্থনীতি ও ব্যবসা ঢাকা মতামত

গৃহকর্মীদের শ্রমিকের মর্যাদা ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অধিকার এখন সময়ের দাবি

মতামত | লেখক: সাবেক শ্রম সচিব

২০২৬ সালের মহান মে দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’। এই প্রতিপাদ্যে শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, পেশাগত নিরাপত্তা ও সুস্থ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রতিপাদ্যের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের শ্রম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের শ্রমখাতে জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এই সময়ে আরএমজিসহ বিভিন্ন সেক্টরে কারখানা বন্ধ, বকেয়া বেতন, ন্যায্য পাওনা ও ন্যূনতম মজুরির দাবিতে ব্যাপক শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিকরা রাস্তায় নামেন।

শিল্পাঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে।

বিজয়নগরের শ্রমভবন অবরোধ, সচিবালয় ঘেরাও এবং যমুনা অবরোধের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দিনরাত কাজ করতে হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ পলাতক বা মামলায় জড়িত থাকায় কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংক হিসাব জব্দ, এলসি জটিলতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ সম্ভব হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এমন পরিস্থিতিতে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে ১৮ দফা সমঝোতা করা হয়। বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও সুবিধা প্রদানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও চাপ ছিল। আইএলও, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক অধিকার ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতের বিষয়ে বাংলাদেশকে চাপ প্রয়োগ করে। জেনেভায় আইএলও’র বিভিন্ন বৈঠকে শ্রমখাত নিয়ে জবাবদিহি করতে হয়েছে।

তবে এক বছরের মধ্যে শ্রম আইন সংশোধন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন (সি-১৫৫, সি-১৮৭ ও সি-১৯০) অনুমোদন এবং বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।

এর পাশাপাশি সুলতান কমিশনের ৮৭টি এবং নারী শ্রমিকদের অধিকার সংক্রান্ত শিরিন কমিশনের ১০টি সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তারপরও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। বিশেষ করে গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং শিশুশ্রম নিরোধ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

মে দিবসের এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি—এটাই সময়ের দাবি।

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *