নিজস্ব প্রতিবেদক:
হাইকোর্টে তথ্য গোপন ও জামিন আদেশে জালিয়াতির মাধ্যমে সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) জন্য তৈরি পোশাক জব্দের মামলার প্রধান আসামি সাহেদুল ইসলাম (২৫) কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বিষয়টি নজরে আনার পর বুধবার (২৯ এপ্রিল) অভিযোগ আমলে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে তদন্তের নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) অ্যাটর্নি জেনারেল বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। এরই মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং কিছুটা অগ্রগতিও হয়েছে বলে জানা গেছে।
🔹 যেভাবে সামনে আসে অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় সাত মাস আগে চট্টগ্রামের ‘রিংভো অ্যাপারেলস’-এর মালিক সাহেদুল ইসলাম হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন। ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি আব্দুল্লাহ ইউসুফ সুমনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে আবেদনটি শুনানির জন্য আসে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় ভিন্ন একটি মামলার এজাহার ও তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে ‘কুকি-চিন’ সংশ্লিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। সেই ভিত্তিতে আদালত তাকে জামিন দেন এবং বিচারপতিরা আদেশে সই করেন।
🔹 আদেশে জালিয়াতির অভিযোগ
পরবর্তীতে মূল জালিয়াতি ঘটে জামিন আদেশে—এমনটাই দাবি তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের। অভিযোগ অনুযায়ী, আদেশের প্রথম পৃষ্ঠায় থাকা মামলার তথ্য, থানার নাম ও অভিযোগের ধারা পরিবর্তন করে সেখানে কুকি-চিনের পোশাক জব্দের মামলার নম্বর ও ধারা বসানো হয়।
এই পরিবর্তিত আদেশ দাখিলের মাধ্যমেই কারা কর্তৃপক্ষ সাহেদুলকে মুক্তি দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
🔹 আরেক আসামির জামিন আবেদনে ধরা পড়ে অসঙ্গতি
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে চলতি সপ্তাহে, যখন একই মামলার আরেক আসামি উচ্চ আদালতে জামিন চাইতে গিয়ে আগের এই জামিন আদেশকে নজির হিসেবে উপস্থাপন করেন। তখন নথিতে অসঙ্গতি ধরা পড়ে এবং বিষয়টি সামনে আসে।
🔹 কী ছিল পোশাক জব্দের মামলায়
২০২৫ সালের ১৭ মে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় ‘রিংভো অ্যাপারেলস’-এর গুদাম থেকে কেএনএফের জন্য তৈরি বলে দাবি করা ২০ হাজার ৩০০টি পোশাক জব্দ করা হয়।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, প্রায় দুই কোটি টাকার বিনিময়ে এসব পোশাকের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হলে সাহেদুল ইসলামসহ তিনজনকে আসামি করা হয়।
অপর দুই আসামি হলেন গোলাম আজম (৪১) ও নিয়াজ হায়দার (৩৯)।
🔹 সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের তদন্ত
ঘটনার পর অ্যাটর্নি জেনারেল বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন তদন্ত শুরু করে।
আদালত প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাইকোর্ট বিভাগের কোনো বেঞ্চ কর্মকর্তা বা ফৌজদারি শাখার কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এত বড় জালিয়াতি সম্ভব কি না—সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
🔹 রেজিস্ট্রার জেনারেলের বক্তব্য
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জানিয়েছেন, তথ্য গোপন ও জালিয়াতির মাধ্যমে জামিনের ঘটনা সত্য বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তদন্ত চলছে এবং দ্রুতই বিস্তারিত জানানো হবে।
🔹 আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
আইনজীবীদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়ার ভেতরে কোনো চক্রের যোগসাজশ ছাড়া এমন জালিয়াতি সম্ভব নয়। তাই ঘটনার গভীরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট দায়ীদের শনাক্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

