অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অপরাধ ‍ও দুর্নীতি এক্সক্লুসিভ লিড নিউজ সারাদেশ

শ্রীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষের বাণিজ্য ৮ কোটি টাকার জমি ১১ কোটি টাকায় মর্টগেজ

শহীদুল ইসলাম বিশেষ প্রতিনিধি।

গাজীপুরের শ্রীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ভূমি ক্রয়-বিক্রয় ও রেজিস্ট্রেশনসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ফাইল নিষ্পত্তির অভিযোগও রয়েছে। শুধু সাধারণ জমির লেনদেন নয়, বিতর্কিত মালিকানা ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত জমিও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি এবং পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ করার অভিযোগ উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভ্যালমন্ট সোয়েটার্স লিমিটেড-কে ঘিরে এমন একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে ভূমি মালিকানা, ব্যাংক ঋণ, সম্পত্তির মূল্যায়ন, মর্টগেজ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের নামে জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকানা ও ওয়ারিশদের দাবির বিষয় যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না করেই জমি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে ওই জমি ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ রেখে ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

৩.৪২ একর জমির মূল্য প্রায় ৮ কোটি, মর্টগেজে ১১ কোটি?
অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভ্যালমন্ট সোয়েটার্স লিমিটেডের প্রায় ৩.৪২ একর জমির মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা হলেও ব্যাংকের মর্টগেজসংক্রান্ত নথিতে প্রায় ১১ কোটি টাকা মূল্য দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে জমিটির প্রকৃত বাজারমূল্য, সরকারি মূল্য, ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়ন, অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ এবং মর্টগেজ দলিলের তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
প্রশ্ন উঠেছে—১১ কোটি টাকা মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি কী, মূল্যায়ন করেছে কোন প্রতিষ্ঠান, মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কী তথ্য দেওয়া হয়েছে এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোন কোন নথি যাচাই করে ওই মূল্য গ্রহণ করেছে?
যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে প্রকৃত সম্পদের মূল্য সম্পর্কে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরঞ্জিত তথ্য উপস্থাপন করে ব্যাংক ঋণসুবিধা নেওয়া হয়েছে, তাহলে বিষয়টি ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন, সম্পদ মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিধিবিধানের আলোকে তদন্তের দাবি রাখে।

ব্যাংক এশিয়ার উত্তরা শাখায় নথি—কীভাবে হলো মূল্যায়ন?
অভিযোগকারীদের দাবি, এ-সংক্রান্ত কিছু নথি ব্যাংক এশিয়ার উত্তরা শাখায় নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—জমিটির মূল্য নির্ধারণ কে করেছেন, কোন মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়েছে, জমির মালিকানা ও ওয়ারিশ যাচাই কীভাবে হয়েছে এবং মর্টগেজ গ্রহণের আগে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড কতটা যাচাই করেছে?
এছাড়া জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ বা ওয়ারিশদের দাবি বিদ্যমান থাকলে সেই তথ্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
ওয়ারিশদের অভিযোগ: জমি বিক্রি হলেও ন্যায্য অধিকার মেলেনি
ভুক্তভোগী কয়েকজন ওয়ারিশের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দাগের মধ্যে তাদের পূর্বপুরুষের জমি রয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালী একটি চক্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে জমি বিক্রির প্রক্রিয়ায় তাদের ন্যায্য অধিকার ও দাবি উপেক্ষা করেছে।
তাদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও এখন পর্যন্ত তারা কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাননি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, নিজেদের জমির অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে গিয়ে তারা চাপ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে।

শিল্পায়নের আড়ালে ভূমি বিরোধ মীমাংসা না করেই ঋণ?
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে কর্মসংস্থানের নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভূমি মালিকানা, উত্তরাধিকার, রেজিস্ট্রেশন কিংবা ব্যাংক ঋণ অনুমোদনের আইনগত প্রক্রিয়া শিথিল হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন হলো—কোনো জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে তা যথাযথভাবে নিষ্পত্তির আগে কীভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে রেজিস্ট্রি হলো? এরপর একই জমি কীভাবে ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ হিসেবে গ্রহণ করা হলো?
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা, মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দায়িত্বশীলদের যাচাই প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ঘুষের অভিযোগ: কারা নিচ্ছে, কারা দিচ্ছে?
শ্রীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত কাজ সম্পন্ন করতেও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। আরও অভিযোগ রয়েছে, জমির মালিকানা জটিলতা কিংবা দ্রুত রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন হলে মধ্যস্বত্বভোগী একটি চক্রের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা করা হয়।
ভ্যালমন্ট সোয়েটার্সের জমির রেজিস্ট্রেশন বা সংশ্লিষ্ট দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি ও বৈধ খরচের বাইরে কোনো অর্থ লেনদেন হয়ে থাকলে দলিল নম্বর, রেজিস্ট্রির তারিখ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক, মধ্যস্থতাকারী এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন:
অভিযোগে কিছু ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশের কথাও বলা হয়েছে। তবে কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে ব্যাংকের ঋণ ফাইল, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, আইনজীবীর মতামত, টাইটেল সার্চ রিপোর্ট, মর্টগেজ দলিল, অনুমোদন নোট এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে একই জমির মূল্য বিভিন্ন নথিতে ভিন্নভাবে উল্লেখ থাকলে মূল্যায়নের তারিখ, মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান, জমির শ্রেণি, অবস্থান, বাজারমূল্য এবং ব্যাংকের অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ মিলিয়ে দেখা জরুরি।

তদন্তের দাবিতে ১০ প্রশ্ন:
অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় ভুক্তভোগী ওয়ারিশরা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নয়—ভূমি অফিস, ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নথিও একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্তকারীদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো হলো—
১. ৩.৪২ একর জমির প্রকৃত মালিক কারা?
২. সংশ্লিষ্ট দাগগুলোর মূল খতিয়ান ও পূর্ববর্তী দলিল কী বলে?
৩. সব ওয়ারিশের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না?
৪. জমির রেজিস্ট্রি কোন মূল্য দেখিয়ে সম্পন্ন হয়েছে?
৫. ব্যাংকের মর্টগেজ নথিতে ১১ কোটি টাকা মূল্য দেখানোর ভিত্তি কী?
৬. ব্যাংকের মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কে এবং তার প্রতিবেদন কী ছিল?
৭. জমির মূল্য ও মর্টগেজ মূল্যের মধ্যে পার্থক্যের কারণ কী?
৮. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের কোনো প্রমাণ আছে কি না?
৯. জমি নিয়ে বিরোধের তথ্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না?
১০. কোনো সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকর্তা, দলিল লেখক বা মধ্যস্বত্বভোগী অনিয়মে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

দুদক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি জরুরি:
অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি শুধু ভূমি বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরকারি দপ্তরে ঘুষ, সম্পদের মূল্যায়নে অসঙ্গতি, ব্যাংক ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম এবং মালিকানা নিয়ে বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি জামানত হিসেবে গ্রহণের বিষয়ও সামনে আসবে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংক, জেলা প্রশাসন, নিবন্ধন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে দুদকের সঙ্গে কথা বললে সংশ্লিষ্টরা জানান, বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মূল প্রশ্ন এখন একটাই—প্রায় ৮ কোটি টাকা মূল্যমানের জমি কীভাবে ১১ কোটি টাকা মূল্যের মর্টগেজে গেল, এবং এই প্রক্রিয়ায় কেনো অনিয়ম বা অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছিল —নথিপত্রের নিরপেক্ষ তদন্তেই তার উত্তর মিলবে।

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *