অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অপরাধ ‍ও দুর্নীতি এক্সক্লুসিভ বাগেরহাট রাজনীতি লিড নিউজ

বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার ৫ নম্বর গাওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় — এলাকাবাসীর ক্ষোভ, তুলকালাম ও চায়ের দোকানে আলোচনার ঝড়


(ক্রাইম রিপোর্টার)
বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার ৫ নম্বর গাওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, ভূমিদখল, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগগুলোকে কেন্দ্র করে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে এখন চেয়ারম্যান রেজাউল করিমের কর্মকাণ্ড নিয়েই চলছে তুমুল আলোচনা বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রেজাউল করিম এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করেন। এলাকাবাসীর দাবি, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন ও শেখ তন্ময়ের ঘনিষ্ঠতা এবং তাদের রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে গেছেন। এছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগপন্থী প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় তিনি তার প্রভাব বলয় আরও শক্তিশালী করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনসহ অনেকের জমি ভয়ভীতি ও জোরপূর্বক দখল করে নিজের ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, তার বিরুদ্ধে শত শত বিঘা জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মাছের ঘের, তেলের পাম্প ও ফিশ ফিড কারখানাসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়ার পেছনে অবৈধ অর্থের সংশ্লিষ্টতা আছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তারা মনে করেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত গরিব, দুঃখী ও ভূমিহীন মানুষের মাঝে বণ্টন করা উচিত।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মাদক ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় ও উৎসাহ দিয়ে এলাকার যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার নেপথ্যেও রেজাউল করিমের ভূমিকা রয়েছে। তাদের দাবি, তার প্রভাব বলয়ের কারণে এলাকায় মাদক ব্যবসা বিস্তার লাভ করেছে এবং এতে তরুণ সমাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে কথা বললেই হুমকি, মারধর, গুম ও হামলার ভয় দেখানো হতো। এলাকাবাসীর অভিযোগ, তার নেতৃত্বে “সর্বহারা পার্টি” নামে একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে ওঠে, যারা অস্ত্রের মুখে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে চাঁদা আদায় করত। অভিযোগ রয়েছে, কেউ রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে কথা বললে রাতের আঁধারে বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, মোটা অঙ্কের টাকা আদায় এবং জমি লিখে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হতো। পরবর্তীতে সেই জমি জোরপূর্বক দখল করে নিজের বা ঘনিষ্ঠজনদের নামে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ওই সর্বহারা বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন রেজাউল করিম নিজেই। সর্বহারা পার্টির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘদিন বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ভবনে অস্থায়ী যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প পরিচালনা করা হয় এবং একাধিকবার বিশেষ অভিযান চালানো হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব অভিযানে সর্বহারা পার্টির একাধিক সদস্য গ্রেপ্তার হয় বলেও দাবি করা হয়। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, যৌথ বাহিনীর সঙ্গে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষে কয়েকজন সর্বহারা সদস্য নিহত হয় এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যকেও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল বলে এলাকায় প্রচলিত অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বাগেরহাটের কয়েকটি থানা জুড়ে সর্বহারা পার্টির কার্যক্রম এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল যে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাতের বেলা নিরাপদে ঘুমানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে জানান স্থানীয়রা। তারা আরও বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় অনেক এলাকায় সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত পাড়া-মহল্লা ও রাস্তাঘাটে পাহারা এবং অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হতো সর্বহারা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের পেছনে রেজাউল করিমের প্রভাব ছিল এবং বর্তমানে তিনি পুনরায় সেই ধরনের সন্ত্রাসী বলয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাকে “সর্বহারার গডফাদার” বলেও আখ্যায়িত করেন।
এলাকার সুপরিচিত দানবীর পরিবার হিসেবে পরিচিত ইন্তাজ ফকিরের পরিবারের কথাও উল্লেখ করেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, ইন্তাজ ফকির পূর্বপুরুষ থেকেই সচ্ছল ও জমিদার পরিবারের সদস্য ছিলেন। তিনি মসজিদ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে জমি দানসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। তার ছেলে সুখ মিয়া এলাকায় একজন দানশীল ও জনদরদী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় সুখ মিয়াকে নানা নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়তে হয়। এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর হামলার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি। ওই ঘটনার প্রতিবাদে এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলেও জানা যায়।
স্থানীয়দের দাবি, ওই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বর্তমান সরকারের রেল, নৌ, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমও অংশ নেন এবং ঘটনার নিন্দা জানান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ১৯৩টি বানোয়াট ও গায়েবি মামলার আসামি হন বলে দাবি করা হয়। এছাড়া তিনি ৯ বার গ্রেপ্তার, প্রায় সাড়ে চার বছর কারাভোগ, ৯৭ দিন রিমান্ড এবং তিন দিন গুমের শিকার হয়েও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, এমন একজন স্বচ্ছ ও ক্লিন ইমেজের মন্ত্রীর জন্মস্থান এলাকায় কীভাবে রেজাউল করিমের মতো বিতর্কিত ব্যক্তি এখনও অবলীলায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছেন এবং পুনরায় “সর্বহারা পার্টি” ধরনের সন্ত্রাসী বলয় গড়ে তোলার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন—সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
এছাড়া রেজাউল করিমের নামে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, “কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে কিংবা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তিনি বারবার জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন?”—এ বিষয়েও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন তারা।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছে বলেও জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, একসময় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন এবং ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান। বর্তমানে তিনি এলাকায় পুনরায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন স্থানীয় ব্যক্তি গণমাধ্যমকে বলেন, “আপনারা যদি সত্য ঘটনাগুলো তুলে ধরেন, তাহলে এলাকাবাসী উপকৃত হবে এবং প্রশাসনের নজরে বিষয়গুলো আসবে।” আরেকজন বলেন, “গণমাধ্যম জাতির বিবেক। সত্য প্রকাশ হলেই প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ হয়।”
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান রেজাউল করিমের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।_________

এমডি রবিউল ইসলাম, ক্রাইম রিপোর্টার________________
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
এ ঘটনায় অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে উঠে আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য ও অভিযোগ। পরবর্তী পর্বে প্রকাশ করা হবে এমন কিছু তথ্য, যা এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে “চোখ কপালে ওঠার মতো”। বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন আমাদের পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায়।

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *