বিশেষ প্রতিবেদক:
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় একটি আবাসিক কওমি মাদরাসায় এক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসার পর দেশজুড়ে আবাসিক মাদরাসাগুলোতে শিশুদের, বিশেষ করে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
🔴 নরসিংদীতে কী ঘটেছে
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার হাশিমপুর এলাকার একটি আবাসিক মাদরাসার শিক্ষক ও মুহতামিমের বিরুদ্ধে প্রায় ১০ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়েছে।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, ঘটনার মেডিকেল প্রতিবেদন পাওয়া গেছে এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দুই মাস আগে মেয়েটিকে ওই মাদরাসায় ভর্তি করা হয়েছিল। ঘটনার দিন রাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশুটি।
পরদিন সকালে তাকে এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠানো হলে বিষয়টি পরিবারের নজরে আসে। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সে পরিবারের কাছে রয়েছে।
ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয়রা মাদরাসায় ভাঙচুর চালালে অভিযুক্ত শিক্ষক পালিয়ে যায়। পরে শিশুটির মা থানায় মামলা করেন।
🔴 একক ঘটনা নয়
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক মাদরাসায় শিশু নির্যাতনের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে।
- সিরাজগঞ্জে এক শিক্ষককে যৌন হয়রানির অভিযোগে আটক করা হয়
- চাঁদপুরে একই অভিযোগে শিক্ষক সাময়িক বহিষ্কার
- কুষ্টিয়ায় এক মাদরাসা পরিচালক গ্রেপ্তার
- ২০১৯ সালে ফেনীতে নুসরাত হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে
এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো পুরো ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
🔴 মাদরাসাগুলো চলে কীভাবে
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ কওমি আবাসিক মাদরাসা ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত হয়।
প্রতিষ্ঠাতা বা মালিকই মূল নিয়ন্ত্রণে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটি থাকলেও তা কার্যত স্বাধীন নয়।
ছোট শিশুদের হিফজ শিক্ষা দেওয়া হয় এমন অনেক মাদরাসায় নিয়মিত তদারকির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
🔴 তদারকি কেন দুর্বল
মাদরাসা বোর্ডের তদারকির কথা থাকলেও বাস্তবে তা সীমিত। বড় মাদরাসাগুলো কিছুটা নজরদারিতে থাকলেও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় নজরদারির বাইরে।
অন্যদিকে ধর্মীয় সংবেদনশীলতার কারণে প্রশাসন অনেক সময় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে চায় না—এটিও তদারকি দুর্বল হওয়ার একটি কারণ।
🔴 নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্ন
কিছু মাদরাসায় মেয়েদের জন্য আলাদা নারী তত্ত্বাবধায়ক থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ শিক্ষকই আবাসিক অংশের দায়িত্ব পালন করেন—যা ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
👉 শক্ত মনিটরিং
👉 জবাবদিহিতা
👉 নিয়মিত পরিদর্শন
না থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানো কঠিন।
🔴 তথ্যই নেই
সবচেয়ে বড় সমস্যার একটি—দেশে মোট কওমি মাদরাসার সঠিক সংখ্যা নেই।
সরকারি হিসেবে প্রায় ২০ হাজার বলা হলেও বাস্তবে সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়।
কতগুলো আবাসিক, কতগুলো মেয়েদের জন্য—এমন নির্ভরযোগ্য তথ্যও অনুপস্থিত।
🔴 কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা
কওমি মাদরাসা বোর্ডের প্রতিনিধিরা দাবি করছেন, তাদের আওতায় থাকা মাদরাসাগুলোতে পরিদর্শন ব্যবস্থা রয়েছে এবং সচেতনতা বাড়াতে কাজ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে গবেষকরা বলছেন,
👉 “শুধু নীতিকথা নয়, কার্যকর তদারকি দরকার”
⚠️ শেষ কথা
নরসিংদীর ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—
এটি পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে।
👉 প্রশ্ন এখন একটাই:
আবাসিক মাদরাসায় থাকা মেয়েরা আসলে কতটা নিরাপদ?

