রবিউল ইসলাম
ক্রাইম রিপোর্টার
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হামলায় গুরুতর আহত মোঃ আজিবুর রহমান (৪৬) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার ঘটনায় দায়ের করা কালিয়াকৈর থানার মামলা নং-৪৬, তারিখ ২৪/০৭/২০২৬ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। মামলার অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের দাবিতে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কর্মসূচিতে স্থানীয় বাসিন্দা, নিহতের স্বজন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাদের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পরও তারা মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন না। পুলিশকে একাধিকবার বিষয়টি জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না এবং বিষয়টি নিয়ে তালবাহানা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা বলেন, তারা কোনো পক্ষের হয়ে কর্মসূচি পালন করছেন না। তাদের দাবি একটাই—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক, প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হোক।
🔴 ২৩ জুলাইয়ের ঘটনায় গুরুতর আহত আজিবুর রহমান
২৩ জুলাই ২০২৬ রাতে কালিয়াকৈরের ঠাকুরপাড়া বাজার এলাকায় আজিবুর রহমানের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। রাত আনুমানিক ৮টা ২০ মিনিটের দিকে তার পথরোধ করে কয়েকজন ব্যক্তি মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববিরোধের জেরে কয়েকজন ব্যক্তি আজিবুর রহমানের অটোরিকশার গতিরোধ করেন। এরপর তাকে ধারালো অস্ত্র, লোহার রড ও লাঠিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধর করা হয়।
হামলার একপর্যায়ে মোঃ সুমন হোসেন (২৮) ধারালো দা দিয়ে আজিবুর রহমানের মাথার বাম পাশে আঘাত করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে তার মাথায় গুরুতর জখম ও রক্তপাত হয়।
অন্যদিকে মোঃ সাগর হোসেন (২৬) লোহার রড দিয়ে তার মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আঘাত এড়াতে গেলে রডটি তার শরীরের অন্য অংশে লাগে এবং এতে গুরুতর আঘাতের সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে গুরুতর আহত অবস্থায় আজিবুর রহমানকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তার মৃত্যু হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
🔴 মামলা নং-৪৬, আসামি তিনজন
ঘটনার পরদিন ২৪ জুলাই ২০২৬ কালিয়াকৈর থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে—
১. মোঃ সাগর হোসেন (২৬)
২. মোঃ সুমন হোসেন (২৮)
৩. মোঃ শরীফ হোসেন (৫২)
এছাড়া আরও ৪/৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
মামলায় হামলা, গুরুতর জখম, ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড দিয়ে আঘাত এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারিত হবে।
🔴 মামলার অগ্রগতি নিয়ে এলাকাবাসীর প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলা হওয়ার পর তারা একাধিকবার পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন না।
কয়েকজন স্থানীয়ের দাবি, অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। নিহতের পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি বা হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশকে বারবার অবহিত করার পরও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারসহ মামলার বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তাদের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের তালবাহানা করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
🔴 ‘আমরা কোনো পক্ষের নই, আইনের শাসন চাই’
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, তারা কাউকে বিনা বিচারে শাস্তি দেওয়ার দাবি করছেন না। তারা চান নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক।
তাদের বক্তব্য, কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার কেউ নির্দোষ হলে তাকেও যেন হয়রানি করা না হয়।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তাদের দাবি, একজন মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় যদি মামলার অগ্রগতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
🔴 আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি
শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও র্যালি থেকে বক্তারা মামলা নং-৪৬-এর অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তদন্তের মাধ্যমে তাদের ভূমিকা বের করার আহ্বান জানানো হয়।
তাদের দাবি, নিহত আজিবুর রহমানের পরিবার যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় এবং মামলার তদন্তে কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা না থাকে।
তারা আরও বলেন, আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে চান না। তদন্তকারী সংস্থা প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করবে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
🔴 পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
আজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, মামলার কারণে নিহতের পরিবার বিভিন্ন ধরনের চাপ ও ভয়ভীতির মধ্যে রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, পরিবারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি জানানো হয়ে থাকলে পুলিশ যেন তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
🔴 মৃত্যুর পর মামলার আইনগত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন
আজিবুর রহমান গুরুতর আহত হওয়ার পর যে মামলা দায়ের করা হয়েছিল, পরবর্তীতে তার মৃত্যু হওয়ায় মামলাটির বর্তমান আইনগত অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মৃত্যুর পর মামলায় কোনো ধারা পরিবর্তন বা সংযোজন করা হয়েছে কি না, কিংবা এ বিষয়ে নতুন কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না—তা পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
এ কারণে মৃত্যুর পর মামলার বর্তমান অবস্থান, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং ঘটনার সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্কসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
🔴 গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে বক্তব্য ও ভিডিও ধারণ
শুক্রবারের কর্মসূচিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা, নিহতের পরিবারের সদস্য ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য নেন।
কর্মসূচির ভিডিও ধারণ করা হয় এবং অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হয়।
স্থানীয়রা বলেন, তারা চান ঘটনাটি স্বচ্ছভাবে মানুষের সামনে আসুক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুক।
🔴 পুলিশের বক্তব্যের অপেক্ষায়
মামলার অগ্রগতি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা, আজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর মামলার বর্তমান আইনগত অবস্থান এবং এলাকাবাসীর অভিযোগের বিষয়ে কালিয়াকৈর থানা পুলিশের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
🔴 সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের দাবি
আজিবুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের প্রধান দাবি—ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটন।
হামলার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজিবুর রহমানের মৃত্যুর সঙ্গে ওই ঘটনার সম্পর্কসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, কোনো ধরনের প্রভাব বা পক্ষপাত ছাড়াই মামলাটির তদন্ত সম্পন্ন হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

