আইন আদালত দুর্ঘটনা নারী ও শিশু সারাদেশ

দেবিদ্বারে লরির চাকায় ঝরল ৮ বছরের মিনহার প্রাণ, মায়ের অভিযোগে চালক আটক।

নিজস্ব প্রতিবেদক | এইচ এম শাহীন |

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দক্ষিণ চান্দলা বাড়ানি গ্রামের মনিরুল ইসলামের আট বছর বয়সী মেয়ে মিনহা মনির সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মায়ের চোখের সামনেই লরির চাপায় প্রাণ হারায় শিশুটি। এ ঘটনায় নিহত শিশুর মায়ের দায়ের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে লরিচালককে আটক করেছে হাইওয়ে পুলিশ। জব্দ করা হয়েছে দুর্ঘটনায় জড়িত লরিটিও।

সোমবার (২ নভেম্বর ২০২৬) বেলা ২টার দিকে দেবিদ্বার উপজেলার ছোট শালঘর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ব্রিজে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত মিনহা মনি মনিরুল ইসলাম ও জুলেখা আক্তার দম্পতির প্রথম সন্তান।

পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানা যায়, কোম্পানীগঞ্জ থেকে শিশুকে চিকিৎসকের কাছে দেখানোর পর মায়ের সঙ্গে দেবিদ্বার উপজেলার ছোট শালঘর গ্রামে নানা বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয় মিনহা। পথে ছোট শালঘর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ব্রিজে সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে নেমে রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল তারা।

এ সময় উত্তর দিক থেকে আসা একটি লরি শিশুটিকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

নিহত শিশুর মা জুলেখা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মেয়েকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে বাবার বাড়ি যাওয়ার পথে ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ উত্তর দিক থেকে আসা একটি লরি আমার মেয়েকে চাপা দেয়। চোখের সামনে নিজের সন্তানের এমন মৃত্যু আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।

দুর্ঘটনায় জড়িত লরিটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর চট্টগ্রাম মেট্রো-ঢ-৮১৪৯৪২। চালকের নাম মোহাম্মদ করিম উদ্দিন। তাঁর পিতার নাম বেচু মিয়া (শহীদুল্লাহ) এবং মাতার নাম নুরজাহান। তাঁর ঠিকানা: বাসা/৭৮৬, ঝিলুর বাড়ি, জঙ্গল কাইয়া পুটিয়া, পোস্ট: মির্জারহাট, থানা: ফটিকছড়ি, জেলা: চট্টগ্রাম।

এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় কুমিল্লা রিজিয়নের মিরপুর হাইওয়ে থানার পুলিশ। মিরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনিসুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পরে তিনি নিজে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং সন্ধ্যা ৭টার দিকে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন।

তিনি আরও জানান, নিহত শিশুর মা জুলেখা আক্তারের দায়ের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে লরিচালক মোহাম্মদ করিম উদ্দিনকে আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় জড়িত লরিটি হাইওয়ে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

কুমিল্লা–সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

এদিকে কুমিল্লা–সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের মতে, এ মহাসড়কের অনেক অংশ এমনিতেই তুলনামূলক সংকীর্ণ। এর ওপর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সড়কের দুই পাশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা পার্কিং করে রাখায় যান চলাচলের জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এতে তৈরি হচ্ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কের বিভিন্ন স্টেশনে রাস্তার ওপর দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পাশাপাশি যানবাহনের বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং যেখানে-সেখানে পার্কিং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

তাঁদের মতে, সংকীর্ণ সড়কে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল, অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং এবং চালকদের অসতর্কতা একসঙ্গে পথচারী ও যাত্রীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে বাসস্ট্যান্ড, বাজার ও সেতু এলাকায় পথচারীদের রাস্তা পারাপার আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

হাইওয়ে থানার ওসির বক্তব্য

কুমিল্লা–সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে মিরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনিসুর রহমান জানান, মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ সংকীর্ণ হওয়া, সড়কের পাশে যথাযথ নিয়ম না মেনে যানবাহন পার্কিং, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব বিষয়ে চালকদের আরও সতর্ক হওয়া এবং সড়কে শৃঙ্খলা মেনে চলা জরুরি।

স্থানীয়দের দাবি, মহাসড়কের দুই পাশ থেকে অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধ এবং নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি জোরদার করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এমন দুর্ঘটনা আরও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নিল আট বছরের শিশুর জীবন। মায়ের চোখের সামনে সন্তানের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—আর কত প্রাণহানির পর কুমিল্লা–সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

একটি শিশুর অকালমৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল—সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *