অপরাধ ‍ও দুর্নীতি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কক্সবাজার

দুই হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের মহোৎসব : বিআইডব্লিউটিএতে আওয়ামী আমলের ‘বালু সিন্ডিকেট’ নিয়ে তোলপাড় !

বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ,কে,এম,আরিফ উদ্দিন।
বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ,কে,এম,আরিফ উদ্দিন।

নিজস্ব প্রতিবেদক :  কক্সবাজারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ নামমাত্র মূল্যে বিক্রির ভয়াবহ অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী আমলে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের মহোৎসবে মেতে ওঠে। আর সেই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে রয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনসহ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।

এ ঘটনায় ইতোমধ্যে বিশেষ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি শুধু অনিয়ম নয়—বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ পরিকল্পিতভাবে লুটপাটের একটি ভয়ংকর নেটওয়ার্কের অংশ, যার শিকড় আওয়ামী ফ্যাসিবাদী প্রশাসনিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত।

২ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিক্রি মাত্র আড়াই কোটিতে !’
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ মাত্র ২ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৮ টাকায় ‘টোকিও মিল জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। বিশাল অঙ্কের এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবিশ্বাস্য কম মূল্যে হস্তান্তরের ঘটনায় বিস্মিত দুদক কর্মকর্তারাও।

জানা গেছে, কক্সবাজার সদর উপজেলার এন্ডারসন রোড এলাকার বাসিন্দা আতিকুল ইসলাম (সিআইপি) গত ৪ মার্চ দুদকের প্রধান কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই নড়েচড়ে বসে দুদক।

মাতারবাড়ি প্রকল্পকে বানানো হয় ‘লুটপাটের স্বর্গরাজ্য’ :
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মহেশখালী চ্যানেলের নুনিয়ার ছড়া থেকে আদিনাথ মন্দিরের উজান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু ও মাটি উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই ড্রেজিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে ভয়ংকর কমিশন বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ বেচাকেনার সিন্ডিকেট।

প্রশ্ন উঠেছে—এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ উত্তোলনের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হলো? জেলা প্রশাসনের অনুমতি আদৌ ছিল কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে রহস্য। দুদক ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জব্দ ও যাচাই শুরু করেছে।

মোবাইল কোর্টের অভিযানে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য :
২০২৫ সালের ২ অক্টোবর পরিচালিত মোবাইল কোর্টের নথি, জব্দ তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডও সংগ্রহ করছে দুদক। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মোবাইল কোর্টের অভিযানে বেরিয়ে আসে কোটি কোটি টাকার ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল বাণিজ্যের অন্তরালের ভয়ংকর চিত্র।

দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি সম্পদ বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান এবং চুক্তি সম্পাদনে ভয়াবহ অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট একটি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতেই পুরো প্রক্রিয়া সাজানো হয়েছিল।

আরিফ উদ্দিনকে ঘিরে বিস্তৃত দুর্নীতির জাল : শুধু কক্সবাজার নয়, এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরেও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীতীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম, নদীতীর ইজারা এবং রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী আমলে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা এই কর্মকর্তা সিন্ডিকেট প্রশাসনের ভেতরে কার্যত ‘অপ্রতিরোধ্য শক্তি’তে পরিণত হয়েছিল। ক্ষমতার দাপটে তারা নদী, বন্দর, ড্রেজিং, ইজারা—সবখানেই গড়ে তোলে দুর্নীতির সাম্রাজ্য।

দুদকের বিশেষ টিম মাঠে : পুরো ঘটনার অনুসন্ধানে দুদক দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি টিম গঠন করেছে। দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামকে প্রধান এবং সহকারী পরিচালক সুভাষ চন্দ্র মজুমদারকে সদস্য করে গঠিত এ টিম ইতোমধ্যে নথিপত্র যাচাই-বাছাই শুরু করেছে।

দুদক সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত নিরপেক্ষ করার দাবিও উঠেছে।

আওয়ামী আমলের ‘দুর্নীতির ব্লু-প্রিন্ট ’?  বিশ্লেষকরা বলছেন, বিআইডব্লিউটিএকে কেন্দ্র করে যে দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসছে, তা মূলত আওয়ামী আমলে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক দুর্নীতির একটি ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট, কমিশন বাণিজ্য, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার কারসাজি—সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল এক ধরনের ‘প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ব্যবস্থা’।

জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন—রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুটের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী এই চক্রের বিরুদ্ধে আদৌ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি আগের মতোই সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাবে?

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *